রেকর্ড ৩৩ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছেছে বৈশ্বিক বাণিজ্য

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও ক্রমবর্ধমান সুরক্ষাবাদী প্রবণতার মাঝেও ২০২৪ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্যের রেকর্ড সম্প্রসারণ হয়েছে।

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও ক্রমবর্ধমান সুরক্ষাবাদী প্রবণতার মাঝেও ২০২৪ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্যের রেকর্ড সম্প্রসারণ হয়েছে। এ সময় আগের বছরের তুলনায় বৈশ্বিক বাণিজ্য ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ ৩৩ ট্রিলিয়ন বা ৩৩ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। গত শুক্রবার ইউএন কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ইউএনসিটিএডি) হাল নাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চলতি বছরের বৈশ্বিক বাণিজ্যের বাধাগুলো সম্পর্কেও সতর্ক বার্তা দেয়া হয়েছে। খবর আনাদোলু।

প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ২০২৪ সালে সেবা খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে। এ খাতে বাণিজ্য ২০২৩ সালের তুলনায় ৯ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৭০ হাজার কোটি ডলার, যা পুরো বৈশ্বিক বাণিজ্যের বার্ষিক বৃদ্ধির ৬০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে পণ্য বাণিজ্য ২ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৫০ হাজার কোটি ডলার।

ইউএনসিটিএডি সতর্ক করে বলছে, বিশ্ব বাণিজ্য স্থিতিশীল থাকলেও ২০২৫ সালে চাপে পড়তে পারে। অর্থনৈতিক বিভাজন এড়াতে বৈশ্বিক সহযোগিতা ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংরক্ষণবাদী নীতি ও পরিবর্তিত বাণিজ্য কৌশল প্রধান ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যেখানে সেবা খাতের বাণিজ্য শক্তিশালী থাকলেও পণ্য বাণিজ্য ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হচ্ছে। সরকারগুলো ক্রমবর্ধমান হারে শুল্ক, ভর্তুকি ও শিল্প নীতির ওপর নির্ভর করছে, যা বিশ্ব বাণিজ্যের প্রবাহকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে।

অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্যে উন্নত দেশগুলোকে পেছনে ফেলে দিয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। এ অঞ্চলে বছরে আমদানি ও রফতানি ৪ শতাংশ এবং চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ২ শতাংশ বেড়েছে। এতে মূলত পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নেতৃত্ব দিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুসারে, চীন ও ভারত ২০২৪ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গড় প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে। উভয় দেশ বাণিজ্যে ভালো করেছে, তবে ক্রমবর্ধমান ঘাটতি ও পরিবর্তিত বাণিজ্য কৌশল ২০২৫ সালে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এদিকে ২০২৪ সালে উন্নত দেশগুলোয় বাণিজ্য স্থবিরতা ছিল লক্ষণীয় এবং ডিসেম্বরে শেষ হওয়া প্রান্তিকে ২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া ২০২৩ সালের তুলনায় পণ্য রফতানিতে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং ১১ শতাংশ সেবা রফতানি বাড়ার মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্যে শীর্ষে রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানি বার্ষিক ৬ শতাংশ এবং প্রান্তিক ভিত্তিতে ১ শতাংশ বেড়েছে। তবে পুরো বছরে রফতানি ২ শতাংশ বাড়লেও প্রান্তিক ভিত্তিতে ১ শতাংশ কমেছে।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহ্ত্তম অর্থনীতি চীনে শক্তিশালী পণ্য বাণিজ্য দেখা গেছে। দেশটিতে আমদানি ১ শতাংশ এবং রপ্তানি ৫ শতাংশ বেড়েছে। সেবা বাণিজ্যে চীনের রফতানি ৯ শতাংশ এবং আমদানি বেড়েছে ১৪ শতাংশ।

প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে পণ্য বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা বেড়েছে। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে হয়েছে ৩৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলার, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বেশি। অন্যদিকে ইইউর সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার বেড়ে ২৪ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে চীন। অভ্যন্তরীণ ভোক্তা চাহিদার পতনের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক বিধিনিষেধের মুখে রয়েছে দেশটি। তবে এখনো রফতানি বাণিজ্য চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সচল রেখেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের শক্তিশালী রফতানি দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে জ্বালানি পণ্যের উচ্চ মূল্যের কারণে আগের ঘাটতি কাটিয়ে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে ইইউ। এ পরিবর্তনগুলো বিশ্ব বাণিজ্যের ভারসাম্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে ভবিষ্যতে বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন, শুল্ক নীতি ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

গত বছরের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জয়ের আগে থেকেই মূল অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে শুল্ককে সামনে এনেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর বিশ্বকে একের পর এক শুল্কবাধার দিকে ঠেলে দিয়েছেন তিনি। জাতিসংঘের সংস্থাটির প্রতিবেদনে চলতি বছরের পূর্বাভাসে বিষয়টি উঠে এসেছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ২০২৫ সালের প্রথম দিকে বাণিজ্য স্থিতিশীল থাকলেও ক্রমবর্ধমান ভূ-অর্থনৈতিক উত্তেজনা, সংরক্ষণবাদী নীতি ও বাণিজ্য বিরোধ ভবিষ্যতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।

এরই মধ্যে পরিবহন খরচ কমার মাধ্যমে বিশ্ববাজারে উপাদান ও কাঁচামালের চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়ার সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। এটি ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার সঙ্গে ব্যবসায়ীদের মানিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টার প্রতিফলন। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, শুল্ক বৃদ্ধি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে মূল্য সংযোজিত পণ্য রফতানিতে নিরুৎসাহিত করে ও শিল্পায়ন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত হয়।

এদিকে সম্প্রতি বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের গতি অব্যাহত থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন জার্মানির ডিএইচএল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টোবিয়াস মেয়ার। তবে এ গতি কিছুটা ধীর হবে বলে জানান তিনি। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতির প্রতিক্রিয়ায় নতুন পথ অনুসন্ধান করছে বিশ্ব।

ডিএইচএল ট্রেড অ্যাটলাস ২০২৫ অনুসারে, ২০২৪-২৯ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যে সমন্বিত বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ১ শতাংশ, যা আগের দশকের তুলনায় কিছুটা দ্রুত। এ সময় বাণিজ্য প্রবৃদ্ধিতে নেতৃত্ব দেবে ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন।

আরও